সজলের শিশু কবরে গিয়ে বলে—বাবা উঠো কিন্তু বাবা কোনো জবাব দেয় না

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হামলার ঘটনায় করা মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে আজও চারজন সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাদের মধ্যে সাভারের আশুলিয়া থানায় লাশ পোড়ানোর ঘটনায় নিহত শহীদ সাজ্জাদ হোসেন সজলের মা শাহিনা বেগম সাক্ষ্য দিয়ে বলেন, ‘আমার একমাত্র ছেলে সজল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ত, সে কি চোর ছিল নাকি ডাকাত ছিল? তার হাতে ছিল জাতীয় পতাকা। তাকে এভাবে মেরে পুড়িয়ে ফেলল কেন? আমার ছেলের দুই বছরের একটি শিশু কন্যা রয়েছে। সে প্রতিনিয়ত কবরের বাঁশের খুঁটি ধরে বলে—বাবা উঠো, বাবা উঠো, কিন্তু বাবা কোনো জবাব দেয় না। আমি কী সান্ত্বনা দেব এ ছোট শিশুকে?’ এ বলে আদালতে হাউমাউ করে কান্না করতে থাকেন সাক্ষী। এ সময় ট্রাইব্যুনালে আবগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
আজ রোববার (১৭ আগস্ট) বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালে সাক্ষীর জবানবন্দিতে এসব কথা বলেন শহীদ সাজ্জাদ হোসেন সজলের মা শাহিনা। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন—বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
সাক্ষীর জবানবন্দিতে শাহিনা বেগম বলেন, আমার বর্তমান বয়স আনুমানিক ৪১ বছর। বর্তমান ঠিকানা আশুলিয়া, সাভার, ঢাকা।
সাক্ষী শাহিনা বেগম বলেন, ‘আমি জুলাই ২০২৪ আন্দোলনে শহীদ সাজ্জাদ হোসেন সজলের আম্মু শাহিনা বেগম। আমার ছেলে সাজ্জাদ হোসেন সজল ওই বছরের ৫ আগস্ট আশুলিয়ার বাইপাইল এলাকায় আন্দোলনে যোগ দেয়। আমি আশুলিয়ায় নারী ও শিশু হাসপাতালে পরিচ্ছন্নতা কর্মী হিসেবে কাজ করতাম। ঘটনার দিন (৫ আগস্ট) আমার ছেলে আন্দোলনে যায় এবং আমি হাসপাতালে ডিউটিতে যাই। ওইদিন হাসপাতালে অনবরত গুলিবিদ্ধ রোগী আসছিল। তখন আমি বারবার ছেলেকে ফোন করে বলি, বাবা তুমি বাসায় ফিরে আসো। হাসপাতালে অনেক গুলিবিদ্ধ আহত রোগী আসতেছে, তোমার আন্দোলনে থাকার দরকার নাই। তখন সে আমাকে বলে, তুমি এমন স্বার্থপর কেন আম্মু?’
‘আমি এখন বাসায় যেতে পারব না। আমার সামনে চার চারটা লাশ এবং আমি একজন আহতকে ধরে বসে আছি। বেলা ১১টা-সাড়ে ১১টার দিকে আমার হাসপাতালে দুটি ডেড বডি (মৃতদেহ) আসে। অনেক আহত রোগী আসে। তখন আমি আমার ছেলেকে আবার ফোন করি। তখন ছেলে বলে, আমাকে তুমি কীভাবে ফেরত আসতে বলো। আমি তখন বলি, তুমি আমার একমাত্র ছেলে। তোমার একটি মেয়ে আছে। তোমাকে আমি ইঞ্জিনিয়ার বানাতে চাই, কিন্তু সে বাসায় ফিরে আসেনি। তখন সে আমাকে জবাব দেয়, মা আমি যদি মারা যাই, তাহলে হাজার সন্তান তোমার পাশে দাঁড়াবে। তুমি আমার চিন্তা করো না। তারপর আরও দুটি মৃতদেহ আমার হাসপাতালে আসে। আমি দৌড়ে রিকশার কাছে যাই এবং ভাবতে থাকি, এই বুঝি আমার ছেলে হাসপাতালে এলো। এই সময় একজন বুকে গুলিবিদ্ধ আহত ছেলে আমাদের হাসপাতালে আসে। আমি তাকে এক্স-রে রুমে নিয়ে যাচ্ছিলাম। ঐ সময় ছেলেটি তার মাকে ফোন করে এবং বলে, আম্মু আমি ভালো আছি। আরেকজন আহত ছেলেকে আমি স্ট্রেচারে করে নিয়ে যাচ্ছিলাম। সেই ছেলেটিও তার পাশে থাকা বন্ধুকে বলছিল, আমার অবস্থা আম্মুকে বলো না, তাকে বলো—আমি ভালো আছি। না হলে আম্মু অনেক চিন্তা করবে। এই ভয়াবহ অবস্থা দেখে আমি আমার ছেলেকে বারবার ফোন দিতে থাকি’, যোগ করেন শাহিনা বেগম।
ছেলেকে সতর্ক করার বর্ণনা দিয়ে শাহিনা বেগম তার জবানবন্দিতে বলেন, ‘আবার তাকে ফোন করে বলি, যদি আন্দোলন করতেই চাও তবে এখানে না থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যাও, সেখানে তোমার আরও আন্দোলনকারীরা আছে। আমার ছেলে তখন উত্তর দেয়, তুমি কি পাগল হয়ে গেছো আম্মু? আমার ভাই-বোনেরা গুলি খাচ্ছে, মারা যাচ্ছে তাদের কে রেখে আমি কীভাবে জাহাঙ্গীরনগরে যাব? সর্বশেষ বেলা ২টা ৪৫ মিনিটে আবার তাকে ফোন দেই। তখন সে আমাকে বলে, তুমি কেন আমাকে ফোন দিয়ে বিরক্ত করছো আম্মু? আমি যদি শহীদ হই, তাহলে আমার আইডি কার্ড দেখে আমাকে শনাক্ত করো। বেলা ২টা ৫৫ মিনিটের দিকে আমার হাসপাতালের ডাক্তার বলল—দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে, শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছে, সজলকে আসতে বলো। তাকে দুইবার ফোন দিয়েছিলাম, কিন্তু ফোন কেটে দেয়।’
‘পরে অনবরত কল করেছি, কিন্তু কেউ রিসিভ করেনি। পরে মোবাইলফোন বন্ধ হয়ে যায়। তখন আমি তার বন্ধু-বান্ধবকে ফোন দিয়ে বাইপাইল এলাকায় তার খোঁজ নিতে বলি। তারা বলে, অনবরত গুলি হচ্ছে, আমরা খোঁজ নিতে পারছি না। আশুলিয়া থানার সামনে আমরা যেতে পারছি না। আমি নিজে খোঁজ নিতে যেতে পারিনি, কারণ হাসপাতালে প্রচুর গুলিবিদ্ধ আহত লোক আসছিল’, যোগ করেন শাহিনা বেগম।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে সজলের মা শাহিনা বেগম বলেন, ‘সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টার দিকে হাসপাতাল থেকে আমি ছেলের খোঁজে বের হই। আমার সঙ্গে সজলের বন্ধু শান্তকে নিয়ে বের হই। আমি আশপাশে যত হাসপাতাল আছে, সব হাসপাতালে ছেলের খোঁজ করি কিন্তু পাইনি। আমি আইসিইউতে ঢুকেও রোগীদের মুখ দেখে ছেলেকে খুঁজেছি। সব বেওয়ারিশ লাশ ছিল, তা আমি উল্টেপাল্টে দেখেছি। তারা আমাকে লাশ দেখতে নিষেধ করছিল, কারণ তারা বলছিল—আপনি মা, আপনি সহ্য করতে পারবেন না।’
‘নিহতদের মাথায়, বুকে গুলি লেগে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, এগুলো দেখলে আপনি পড়ে যেতে পারেন। আমার স্বামীও বিভিন্ন হাসপাতালে ছেলের সন্ধানে খোঁজখবর নেয়, কিন্তু ছেলের সন্ধান পাওয়া যায়নি। রাত ৩টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত খোঁজাখুঁজি করে আমি বাসায় ফিরার উদ্দেশ্যে বাইপাইল মোড়ে আসি। তখন আমি সেখানে লাঠিসোঁটা নিয়ে পাহাড়ারত ছাত্রদের দেখতে পাই। তাদের কাছে আমার ছেলের সন্ধান জানতে চাই এবং আমার মোবাইলফোনে থাকা ছবি তাদেরকে দেখাই’, বলেন শাহিনা বেগম।
সাক্ষী শাহিনা বেগম আরও বলেন, ‘তখন একজন ছেলে আমাকে বলে, আন্টি আপনি যদি সহ্য করতে পারেন তাহলে আমি আপনাকে একটা খবর বলতে চাই। তখন আমি বললাম, বাবা আমি আমার ছেলেকে পাওয়ার জন্য সব কিছু সহ্য করতে প্রস্তুত আছি, তুমি বলো। তখন সে ছেলেটি আমাকে বলে, আশুলিয়া থানার সামনে ছয়-সাতটি ছেলেকে হত্যা করে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। আপনি সেখানে আপনার ছেলেকে খুঁজে দেখতে পারেন। আমি আশুলিয়া থানায় যেতে চাইলে অন্য ছাত্ররা আমাকে সেখানে যেতে দেয়নি। তারা আমাকে জোর করে বাসায় পাঠিয়ে দেয়। আমি বাসায় গিয়ে তাহাজ্জুদ ও ফজরের নামাজ পড়ে (৬ আগস্ট) সকাল ৬টার দিকে বাসা থেকে আবার বের হই এবং সকাল আনুমানিক সাড়ে ৬টার দিকে আশুলিয়া থানার সামনে যাই। সেখানে গিয়ে একটা পুলিশের পিকআপ ভ্যানে বেশ কয়েকটি পোড়া লাশ দেখতে পাই। অনেক মানুষ লাশগুলোর ছবি ছবি ও ভিডিও করছিল।’
অর্ধ পোড়া জুতা দেখে লাশ শনাক্ত
শাহিনা বেগম বলেন, ‘আমি ভিড় ঠেলে সামনে যাই এবং একটা ছবি তুলি। এই সেই ছবির প্রিন্ট কপি (প্রদর্শনী-২)। আমি দেখতে পাই, একটি লাশ এমনভাবে পুড়েছে যে পায়ের একটি মোটা হাড় উঁচু হয়ে আছে এবং সে হাড়ের সঙ্গে একটি জুতা পোড়া অবস্থায় ঝুলছে। সামান্ন টাচ করলেই জুতাটা পড়ে যাবে। জুতাটা দেখেই আমি বুঝতে পারি, এই জুতাটি আমার ছেলে সজলের জুতা।’ কথাগুলো বলতে বলতে এ পর্যায়ে সাক্ষী কান্নায় ভেঙে পড়েন।
ছেলের লাশ নিতে বাধা
সাক্ষীর জবানবন্দিতে সজলের মা বলেন, ‘আমি তখন উপস্থিত সেনা সদস্যদের বলি, এটাই আমার ছেলের লাশ। দয়া করে আমার ছেলের লাশ আমাকে দিয়ে দিন। তখন সেনাবাহিনীর সদস্যরা আমাকে বলেন, এখন লাশ দেওয়ার অনুমতি নেই। অনুমতি পাওয়া গেলে আপনাকে জানাব। আমি নিরুপায় হয়ে আমার ছেলের লাশ ফেরত পাওয়ার জন্য আমার কর্মস্থলের হাসপাতালের ডাক্তারদেরকে সহায়তার জন্য অনুরোধ করি। (৬ আগস্ট) বিকেল আনুমানিক সাড়ে ৪টার দিকে সজলের বন্ধুরা আমাকে ফোন দিয়ে যেখানে লাশ পোড়ানো হয়েছিল, সেখানে আসতে বলে। আমি সেখানে বিকেল ৫টার দিকে গিয়ে পৌঁছি। তখন গাড়ি থেকে পোড়া লাশগুলো নামানো হয় এবং শনাক্তের চেষ্টা করা হয়। সেনাবাহিনীর সদস্যরা আমাকে লাশের কাছে যেতে দেয়। সজলের লাশ যখন নামানো হয়, তখন তার সঙ্গে তার কর্মস্থলের আংশিক পোড়া আইডি কার্ড এবং তার মানিব্যাগের ভেতরে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের আইডি কার্ড দেখে আমি আমার ছেলে সজলের লাশ শনাক্ত করি। এই সেই রক্তমাখা আইডি কার্ড (প্রদর্শনী-৩)।’ এ সময় আইডি কার্ডের প্রিন্ট কপি রেখে মূল কপি সাক্ষীকে ফেরত দেওয়া হয়।
সজলের মা আরও বলেন, ‘আমার ছেলের লাশের যখন প্রথম ছবি তুলি, সেখানে আমি দেখতে পাই—তার পোড়া হাতের পাশেই তার মোবাইলফোনটি রয়েছে। এটা দেখে আমি বুঝতে পারি, পোড়ানোর পূর্ব মুহূর্তেও সে জীবিত ছিল এবং ফোন দিয়ে কাউকে কিছু জানানোর চেষ্টা করছিল।’
‘আমার মনে হয়েছে, যখন তাকে পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল তখন সে প্রাণপণে তার অবস্থা আমাদেরকে জানানোর চেষ্টা করছিল বা কোনো মেসেজ লেখার চেষ্টা করছিল। কিন্তু একটার উপর আরেকটা লাশ ফেলার কারণে নিচে পড়ে যাওয়ায় সে আর কোনো মেসেজ লেখা বা কল দেওয়ার সুযোগ পায়নি। আশুলিয়া রাস্তার উপরে অসংখ্য মানুষের উপস্থিতিতে সেনাবাহিনী গান সেলুটের পর জানাজা পড়ানো শেষে আমার ছেলেসহ চারজনের লাশ সংশ্লিষ্ট পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। আমার ছেলের লাশ গ্রহণ করার পর আমার কর্মস্থল হাসপাতালে নিয়ে যাই। হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ ডেথ সার্টিফিকেট ইস্যু করে। তখন তাকে কাফন পরিয়ে কফিনের মধ্যে রেখে হাসপাতালের গাড়িযোগে আমার গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা উপজেলার শ্যামপুর গ্রামে পৌঁছে দেওয়া হয়। সেখানে ৭ আগস্ট ২০২৪ তারিখে তাকে দাফন করি।’
জবানবন্দিতে সাক্ষী শাহিনা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে সজল সিটি ইউনিভার্সিটিতে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি পড়ছিল এবং পাশাপাশি সে টেস্টি ট্রিট নামক ফুড শপে চাকরি করত। আমার ছেলের একজন দুই বছরের কন্যাশিশু আছে। সে তার বাবার কবরের কাছে গিয়ে ডাকাডাকি করে বলে—বাবা উঠো, বাবা উঠো।’ এ সংক্রান্ত একটা ভিডিও ক্লিপ এবং সজলকে জাতীয় পতাকা হাতে রাজপথে আন্দোলনরত থাকা অবস্থায় ধারণকৃত আরেকটি ভিডিও ফুটেজ আদালতে প্রদর্শন করা হয়। উভয় ভিডিও ক্লিপ একটি পেন ড্রাইভের (বস্তু প্রদর্শনী-IV) মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হয়।
‘আমার সন্তানসহ দুই হাজার মানুষকে যারা হত্যা করেছে সেই আসামিদেরসহ এই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল, আইজিপি মামুন, ওবায়দুল কাদের, সাইফুল এমপি, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও পুলিশ লীগের বিচার চাই’, ট্রাইব্যুনালকে বলেন শহীদ সজলের মা শাহিনা বেগম।